বাচ্চার কান্নার কারণ ও করণীয়

জন্মের পর থেকে একটা বাচ্চা পুরোই বাবা মায়ের উপর নির্ভর করে বেচে থাকে। তার খাওয়া, উষ্ণতা, অন্যান্য প্রয়োজন সে নিজে মেটাতে পারেনা। যখন সে কান্না করে তখন বুঝতে হবে সে আসলে তার কোনো একটা প্রয়োজন বা অসুবিধা বোঝাতে চাচ্ছে। কান্না ছাড়া অন্য কোনোভাবে সেটা বোঝানো তার পক্ষে সম্ভব নয়। কান্নাই তার একমাত্র ভাষা। তবে ১-৩ মাস পর্যন্ত বাচ্চারা এমনিতেই কান্না করতে পারে। এই সময়ে তারা পৃথিবীর নতুন পরিবেশের সঙ্গে নিজেকে খাপ-খাওয়ানোর চেষ্টা করতে থাকে।

একটা বাচ্চা বিভিন্ন কারণে কান্না করতে পারে৷ এইজন্যই প্রথম কিছু সপ্তাহ বাচ্চার কান্না শুনলে অনেক বাবা মা ই হুট করে বুঝতে পারেন না বাচ্চা আসলে কি কারণে কান্না করছে বা কি অসুবিধা তার হচ্ছে! সময়ের সাথে বাচ্চা যখন হাসতে বা চোখে চোখ রাখতে শিখে তখন এই ব্যাপারগুলো আস্তে আস্তে সহজ হয়ে যায় বাবা মায়ের জন্য বাচ্চার চাহিদা বোঝার ক্ষেত্রে। কিছুদিন পর বাবা মা কান্নার ধরণ দেখেও অনেক সময় আস্তে আস্তে বুঝতে পারেন বাচ্চা কেনো কাদছে! এক-এক প্রয়োজন এর জন্য বাচ্চার কান্না ও অনেক সময় একেক ধরণের হয়। তাই প্রথম ৬ থেকে ৮ সপ্তাহ নতুন বাবা মা এবং বাচ্চার জন্য একটা চ্যালেঞ্জিং সময়।

চলুন জেনে নেয়া যাক বাচ্চার কান্নার কিছু সাধারণ কারণ এবং সমাধানের কিছু উপায়ঃ

► ১. বাচ্চা ক্ষুধার্ত হলেঃ বাচ্চাদের কান্নার একটা সাধারণ কারণ হল ক্ষুধা। সদ্য জন্ম নেয়া বাচ্চাদের কান্নার একটা প্রধান কারণ ক্ষুধা। তাই যেসব মা বাচ্চাকে বুকের দুধ পান করান বাচ্চা কান্না করলে তারা বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়ানোর চেষ্টা করতে পারেন। বাচ্চা যদি ক্ষুধার্ত হয় তাহলে সে দিলেই খেতে চাইবে। সাধারণত দিনে প্রতি ২-২.৫ ঘণ্টা এবং রাতে ৩-৪ ঘণ্টা পর পর খাওয়ানো প্রয়োজন। তবে যদি বাচ্চাকে ফর্মূলা খাওয়ান সেক্ষেত্রে আর একটু বেশি সময় পর পর খাওয়ানো যেতে পারে।

► ২. পেটে গ্যাস জমা: গ্যাসের সমস্যায় বাচ্চাদের ভোগা একটি স্বাভাবিক ঘটনা। অনেক বাচ্চার পেটে গ্যাস বেশি হয় কিংবা খাবার এর পর পেটে ভালো লাগেনা। যেহেতু তাদের পরিপাক ব্যবস্থা তখন ও পরিপক্ব হয়না তাই কিছু সময় লাগে তাদের পুরো প্রক্রিয়ায় অভ্যস্ত হতে।

এছাড়াও প্রতিবার খাওয়ানোর পরে পেটে গ্যাস বাবল সৃষ্টি হয় এবং অনেক সময় গ্যাস ঢুকেও পড়ে। এইজন্য বাচ্চাকে বার্পিং (বুকে নিয়ে সোজা করে হালকা করে পিঠে চাপড় দেয়া) করা প্রয়োজন। তাহলে গ্যাস বের হয়ে যায় সাধারণত।

► ৩. অতিরিক্ত গরম কিংবা ঠান্ডা অনুভব করলেঃ বাচ্চার কান্নার আরেকটা কারণ বাচ্চা যদি খুব গরম বা খুব ঠান্ডা অনুভব করে। এটা চেক করার জন্য তার পেট বা ঘাড়ের পিছনের দিকে হাত দিয়ে দেখতে পারেন। বাচ্চার রুমের তাপমাত্রা গরম কালে যতটা সম্ভব ঠান্ডা রাখার চেষ্টা করুন৷ আর বাচ্চাকে শোয়ানোর সময় তাকে চিত করে পিঠে ভর দিয়ে শোয়ান। এতে কম্বল এর ভেতর থাকলেও তার শরীর অতিরিক্ত গরম হয়ে যাবেনা।

তাকে অতিরিক্ত জামাকাপড় পরাবেন না৷ আপনি যা পরে আরামদায়ক অনুভব করেন তার চেয়ে এক লেয়ার বেশি জামা পরাবেন তাকে। বাচ্চার বিছানায় সুতির বেডশীট ব্যবহার করুন। এরপর ও সে গরম অনুভব করলে তার গা থেকে এক লেয়ার কাপড় সরিয়ে দিন। একইভাবে সে ঠান্ডা অনুভব করলে অতিরিক্ত আরেক লেয়ার কাপড় পরিয়ে দিন।

► ৪. ভেজা ডায়াপার বা ভেজা কাঁথাঃ বাচ্চার কান্নার আরেকটা কারণ হল বাচ্চা যদি প্রস্রাব বা পায়খানা করে। ভেজা কাঁথা কিংবা ভেজা ডায়াপারে বাচ্চা অস্বস্তি অনুভব করে। অনেক সময় ডায়াপার বা কাঁথা বদলানোর সময় ও বাচ্চা কাঁদে। এর কারণ বদলানোর সময় গায়ে বাতাস লেগে বা হাতের স্পর্শ এর জন্য তাদের ঠান্ডা লাগে৷ কয়েকদিন পর আপনি নিজেই বুঝে যাবেন কিভাবে দ্রুত বদলাতে হবে এবং তাকে আরামদায়ক একটা অনুভূতি দিয়ে বদলানো যাবে।

ডায়াপার বা কাঁথা বদলানোর সময় তাকে একটা খেলনা দিতে পারেন বা তার সাথে কথা বলতে পারেন এতে তার মনোযোগ অন্য দিকে থাকবে। বদলানোর সময়কার ঠান্ডা অনুভূতি সে খেয়াল করবে না।

► ৫. বাচ্চা ক্লান্ত হলেঃ বাচ্চার কান্নার আরেকটা কারণ হল বাচ্চা ক্লান্ত অনুভব করা। মাঝে মাঝে বাচ্চা ওভার টায়ার্ড হয়ে যায় তখন কান্না শুরু করে৷ বাসায় অতিরিক্ত মানুষের সমাগম কিংবা ঘুম আসার পরেও ঘুমাতে না পারার কারণে বাচ্চা কান্না শুরু করে দেয়।

এক্ষেত্রে বাচ্চাকে খাইয়ে তার ঘুমের জন্য একটা পরিবেশ তৈরি করে দিন। তাকে কোলে নিয়ে হালকা একটু দুলিয়ে তাকে শান্ত করুন আস্তে আস্তে। এরপর নিরিবিলি নিরাপদ একটা জায়গায় তাকে শুইয়ে আলো নিভিয়ে দিন, হালকা কোনো মিউজিক চালিয়ে দিতে পারেন একদম লো সাউন্ডে।

► ৬. বাচ্চা আদর চায়ঃ ছোট মানুষ হলেও বাচ্চারা ভালোবাসা চায়। সে চায় কেউ তাকে একটু কোলে নিয়ে দোলাক, বুকে জড়িয়ে রাখুক। বাচ্চা আপনার শরীরের উষ্ণতা, আপনার বুকে মিশে থেকে আপনার হার্টবিট এর শব্দ, আপনার গায়ের গন্ধ খুঁজে। মনে রাখবেন কিছুদিন আগে আপনার পেটে বাচ্চা অনেক যত্নে এবং আরামদায়ক একটা পরিবেশে ছিলো। পৃথিবীতে এসেও সে একই রকম পরিবেশ খুঁজে বেড়ায়।

তাই তাকে তখন একটু বুকে জড়িয়ে কোলে নিয়ে হালকা দোলাতে পারেন। এবং সাথে সাথে তার সাথে কথা বলতে বা তাকে বিভিন্ন ছড়া/গান শোনাতে পারেন। এতে সে স্বস্তি অনুভব করবে। এটা তার মস্তিষ্ক বিকাশের জন্যও সহায়ক।

► ৭. শরীরে ভালো অনুভব না করাঃ অনেক সময় উপরিউক্ত কোনো কারণ ছাড়াও বাচ্চা কান্না করতে পারে৷ সে কান্না হতে পারে দূর্বল স্বরে কান্না বা খুব জোরে চিৎকার করে কান্না। নতুন দাঁত উঠার সময়ও বাচ্চা কাঁদতে পারে। আপনার বাচ্চা যদি কখনও এমনভাবে কান্না করে যা সে সাধারণত করেনা তাহলে অবহেলা করবেন না৷ তার গায়ের তাপমাত্রা চেক করুন৷ তিন মাসের কম বয়সী শিশু হলে গায়ের তাপমাত্রা ৩৮ ডিগ্রি এবং তিন মাস বেশি বয়সী শিশুর ক্ষেত্রে ৩৯ ডিগ্রীর বেশি তাপমাত্রা হলে ডাক্তার এর শরণাপন্ন হোন। এছাড়া তার যদি নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয় ডাক্তার কাছে নিয়ে যান বাসায় সময় নষ্ট না করে।

মোট কথা আপনার বাচ্চা কে আপনার চেয়ে ভালো কেউ বুঝতে পারবেন না। কোনো কারণে যদি আপনার মনে হয় আপনার বাচ্চা ঠিক নেই, তার কষ্ট হচ্ছে তাহলে তাকে দ্রুত কোনো চিকিৎসক এর কাছে নিয়ে যান।

► ৮. কলিক বেবিঃ যদি আপনার বাচ্চার সব ঠিক থাকে যেমন তার খাওয়া, পায়খানা/প্রস্রাব, গায়ের তাপমাত্রা এবং এরপরও সে কাঁদতে থাকে তাহলে বুঝতে হবে আপনার বাচ্চা কলিক। বিশেষজ্ঞগণ এখন ও পরিষ্কারভাবে বলতে পারেন না বাচ্চা কেনো কলিক হয়। এটা বাচ্চাদের ক্ষেত্রে খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। অনেক বিশেষজ্ঞ এটাকে বাচ্চাদের স্বাভাবিক একটি ডেভেলপমেন্ট প্রক্রিয়া বলে থাকেন৷ সুতরাং এটা নিয়ে খুব চিন্তিত হবার কিছু নেই যদি আপনার বাচ্চার অন্য সব ঠিক থাকে।

তাই বাচ্চা যদি অতিরিক্ত কাঁদে তাহলে তাকে ডাক্তার দেখাতে পারেন তার কান্নার অন্য কোনো কারণ আছে কিনা চেক করতে। যদি অন্য কোনো কারণ না থাকে এবং বাচ্চা কলিক হয় তাহলে চিন্তার কারণ নেই। সাধারণত ৩/৪ মাসের মাঝেই বাচ্চা এই সমস্যা কাটিয়ে উঠে।

সংক্ষেপে বাচ্চা কান্না করছে এমন পরিস্থিতিতে যা করতে পারেনঃ

► ঘরে হালকা শব্দ এর কোনো মিউজিক বা অন্য কিছু ছেড়ে দিতে পারেন। ফ্যান এর শব্দ বা ভ্যাকুয়াম এর শব্দ এমন কিছু দিতে পারেন৷ বাচ্চা মায়ের পেটে শব্দময় একটা পরিবেশে থাকে। তাই হুট করে মাঝে মাঝে সে ওই শব্দ মিস করে।
► তাকে দোলাতে পারেন কোলে নিয়ে বা দোলনায়। তাকে গাড়িতে করে কোথাও ঘুরিয়ে আনতে পারেন। 
► হালকা করে তার পেটে মালিশ করে দিতে পারেন। তবে মালিশ করার সময় ও কান্না করলে তা করা থেকে বিরত থাকুন। 
► অনেক বাচ্চা সবসময় ই কিছু চুষতে চায়। সেক্ষেত্রে তাকে প্যাসিফায়ার বা চু-চু দিতে পারেন৷। 
► হালকা গরম পানি দিয়ে গোসল দিতে পারেন। তবে গোসল দেয়ার আগে পানির তাপমাত্রা চেক করুন এটি যেন খুব গরম বা ঠান্ডা না হয়। পানির তাপমাত্রা যেন ৩৭ থেকে ৩৮ ডিগ্রীর মাঝে থাকে।

‼‼ সতর্কীকরণ: যে কোন অবস্থায় নিচের ৩টি জিনিস খেয়াল রাখবেন। 
১. বাচ্চার তাপমাত্রা ১০০ ডিগ্রির বেশী কিনা। 
২. বাচ্চার পেট শক্ত হয়ে গিয়েছে কিনা। 
৩. বাচ্চা অতিরিক্ত দূর্বল হয়ে গিয়েছে এবং খাওয়া, প্রসাব ও পায়খানা স্বাভাবিকের থেকে কমে গিয়েছে কিনা।

যদি উপরের ৩টার যে কোন লক্ষণ দেখতে পান তাহলে যত দ্রুত সম্ভব ডাক্তারের পরামর্শ নিন। আর এই ৩টা লক্ষণ ছাড়া বাবু যদি কান্নাকাটিও করে তাহলে খুব বেশি চিন্তিত হওয়ার কিছু নেই। ওদের ধৈর্য্য ধরে শান্ত করার চেষ্টা করুন। নতুন পরিবেশে খাপ খাওয়ানোর সময় দিন। 🙂

বাচ্চার কান্নার কারণ ও করণীয়