ডেলিভারি পরবর্তী বেবি এবং মায়ের দরকারি কি কি জিনিস প্রয়োজন হয়?

সন্তান জন্মদানের পর সাধারণত সবাই নবজাতককে নিয়েই ব্যস্ত থাকে, এমনকি মা নিজেও। কিন্তু এই সময়ে নবজাতকের পাশাপাশি মায়ের ও যত্নের প্রয়োজন। এই লিখায় ডেলিভারি পরবর্তী সময়ে নবজাতকের পাশাপাশি  মায়ের জন্য দরকারী জিনিসের একটা তালিকা দেয়া হয়েছে। যাতে মা কিছুটা হলেও শারিরীক এবং মানসিকভাবে স্বস্তি পান।

ডেলিভারি পরবর্তী সময়ে মায়ের জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসঃ

  •  স্যানিটারি প্যাড :

সন্তান জন্মদানের পর একজন মায়ের যে জিনিসগুলো অবশ্যই দরকার পড়ে তার মাঝে উল্লেখযোগ্য হল প্যাড। ভালো মানের শোষণক্ষমতা আছে এমন কিছু প্যাড সংগ্রহ করে রাখা উচিত আগেই। এই সময়ে প্রথম কয়েক সপ্তাহ বেশ হেভি ব্লিডিং হয়।  তাই প্রয়োজনমত কিছু প্যাড কিনে রাখুন।

  • হেমোরইয়েডাল প্যাডঃ

এটা ও এক ধরনের প্যাড। ডেলিভারির পর সন্তান জন্মদানের কারণে ভ্যাজাইনা খুব ভালনারেবল অবস্থায় থাকে। এছাড়া অনেকের টিয়ারিং এর জন্য ও বেশ ব্যাথা থাকে। এই প্যাড ভ্যাজাইনাল এরিয়া তে এসবের জন্য বেশ আরাম দেয়। সাথে ইনফেকশান হওয়ার হাত থেকেও সুরক্ষা দেয়। যে কোনো ফার্মেসি তে খুজলেই পেয়ে যাওয়ার কথা। চেষ্টা করবেন অন্তত এক প্যাকেট/বক্স সংগ্রহ করে রাখতে।

হেমোরয়েডাল প্যাড
  • হিটিং প্যাড এবং আইস প্যাকঃ

ডেলিভারি পরবর্তী সময়ে ভ্যাজাইনাল এরিয়ার সাথে ব্রেস্ট ও বেশ সেনসিটিভ/ব্যাথা হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে হিটিং প্যাড বা আইস প্যাক বেশ ভালো কাজে দেয়। তাই সম্ভব হলে এগুলাও হাতের কাছে রাখুন।

  • একটা বড় পাত্র  সিটয বাথ এর জন্যঃ

সিটয বাথ

সিটয বাথ হল এক বিশেষ ধরনের বাথ। এর জন্য আলাদা পাত্র বাজারে কিনতে পয়া যাওয়ার কথা। যদি পাত্র না পান বড় একটা গামলা কিনে রাখতে পারেন। এই বাথের নিয়ম হল, পাত্রে গরম পানি(সহনীয় উষ্ণতার) নিয়ে সেখানে কিছুক্ষণ বসে থাকা। এতে প্রসব পরবর্তী ভ্যাজাইনাতে যে ব্যাথা বা ডিসকম্ফোর্ট থাকে সেটা থেকে অনেকটাই আরাম পাওয়া যায়। পানি ঠান্ডা হয়ে আসলে পানি চেঞ্জ করে যতক্ষণ ভালো লাগে এটা করা যাবে।

  • নার্সিং প্যাডঃ

অনেক মায়ের ব্রেস্ট মিল্ক ফ্লো হেভি থাকে। দেখা যায় মিল্ক সারাদিন একটু একটু লিক হতে থাকে। যাতে জামাকাপড় ও ভিজে যেতে পারে। নার্সিং প্যাড এ সময় খুব কাজে আসে। কিছু নার্সিং প্যাড থাকে ওয়াশেবল। আপনি ধুয়ে পুনরায় ব্যবহার করতে পারেন। কিছু থাকে ওয়ান টাইম ইউজ। সুবিধামত যে কোনো টা কিনে রাখতে পারেন।

নার্সিং প্যাড
  • ব্রেস্ট পাম্প এবং ব্রেস্টমিল্ক  স্টোরেজ ব্যাগঃ

ব্রেস্ট পাম্প এবং স্টোরেজ ব্যাগ ও বেশ দরকারী। বিশেষ করে যেসব মায়েদের বিভিন্ন কাজে বাচ্চা নিয়ে বা বাচ্চাকে বাসায় রেখে বের হতে হয় তাদের জন্য বেশ দরকারী। আপনি দরকার মত মিল্ক ফ্লো যখন থাকবে তখন  পাম্প করে স্টোরেজ ব্যাগে রেখে দিতে পারেন। পাম্প করা মিল্ক রুম টেম্পারেচারে সর্বোচ্চ ৪ ঘন্টা ভালো থাকে। নরমাল ফ্রিজে ৪ দিন পর্যন্ত ভালো থাকে। আর ডিপ ফ্রিজে রেখে দিলে ৬ মাস পর্যন্ত এই মিল্ক ভালো থাকে।

  • আরামদায়ক জামাকাপড়ঃ

কিছু আরামদায়ক জামা রেখে দিন এই দিনগুলোর জন্য। প্রসবের পরপর ই আপনার জরায়ু সাথে সাথে সংকুচিত হয়ে আগের অবস্থায় ফিরে যাচ্ছেনা। তাই এই সময়ে তলপেট সহ পুরো শরীর বেশ সেনসিটিভ থাকে। সাথে থাকে নতুন বাচ্চার যত্ন নেয়ার কাজ। তাই এই সময়ে এমন কিছু আরামদায়ক  কাপড় পরুন যাতে বাচ্চাকে খাওয়ানো সহ অন্যান্য দরকারী কাজ করতে সুবিধা হয়।

  • বেবি ক্যারিয়ারঃ

একটা বেবি ক্যারিয়ার নিয়ে রাখুন। এটা আপনাকে বিভিন্ন কাজে বেশ সাহায্য করবে। ক্যারিয়ারে বাচ্চা থাকলে বাচ্চাও বুকের সাথে আরামদায়ক একটা পরিবেশে থাকবে আর এদিকে আপনার হাত দুটাও ফ্রি থাকবে যেন চাইলে অন্য কাজ করতে পারেন।

বেবি ক্যারিয়ার

বাচ্চার জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসঃ

  • সুতি নরম কাথা বা সোয়াডল করার কাপড়ঃ

বাচ্চা জন্মের পর ই যে জিনিস দরকার হয় সেটা হলে বাচ্চা কে মুড়িয়ে নেয়ার মত কোনো কাপড়। কাপড় টা এমন হওয়া জরুরি যেন বাচ্চা আরাম ও পায় আবার যেন বাচ্চাকে একটু গরম ও রাখে। কারণ নবজাতকের শরীর তাপমাত্রা ধরে রাখতে পারেনা। এজন্য বাইরে থেকে তাদের শরীর যেন ঠান্ডা না হয়ে যায় সেটা খেয়াল রাখতে হয়। বেবি কে মুড়িয়ে রাখার এক জনপ্রিয় পদ্ধতি হল সোয়াডল করা। এতে বাচ্চাকে এমনভাবে কাপড় দিয়ে মুড়িয়ে রাখা হয় যেন বাচ্চা মায়ের পেটে থাকার কাছাকাছি একটা পরিবেশ পায় যেটা নবজাতকের জন্য বেশ জরুরি। বাজারে সোয়াডল করার আলাদা কাপড় পাওয়া যায়। সেটা না পেলে বাসায় নরম সুতি কাপড় দিয়ে বানিয়ে নিতে পারেন।

বেবি সোয়াডল
  • ডায়াপার এবং ওয়াইপসঃ

বাচ্চার জন্য আরেক প্রয়োজনীয় জিনিস হল ডায়াপার এবং ওয়াইপস। অনেকে কাঁথা ব্যবহার করেন। সেটাও ঠিক আছে। যেটাই ব্যবহার করেন না কেন চেষ্টা করবেন বাচ্চার জন্মের পর তা হাতের কাছে রাখতে।

  • ব্যাসিনেট বা নিরাপদ ভাবে বাচ্চাকে ঘুম পাড়ানোর জায়গাঃ

বাচ্চার নিরাপদে ঘুম পাড়ানোর ব্যবস্থা করা অবশ্য করণীয় কাজের মধ্যে একটা। বাচ্চাকে ঘুম পাড়ানোর জায়গায় খেয়াল রাখবেন বাচ্চা ছাড়া অন্য কিছু যেন না থাকে। নবজাতকের বিছানায় যেন কোনো খেলনা, বালিশ, কাঁথা বা অন্য কিছু না থাকে খেয়াল রাখতে হবে। শুধু বাচ্চাকে জামা পরিয়ে একটা কাপড় দিয়ে সোয়াডল করে বাচ্চা যেন ওয়ার্ম থাকে সেটা নিশ্চিত করে নিরাপদে ঘুম পাড়ানো যায় এমন জায়গা হলেই হবে।

বেবি ব্যাসিনেট
  • ডায়াপার র‍্যাশ ক্রিমঃ

অনেক সময় বাচ্চার প্রাইভেট পার্টস এ র‍্যাশ হয়ে যায়। নবজাতকের চামড়া যেহেতু একদম ই পাতলা এবং নরম থাকে তাই পরিষ্কার করার সময় বা ডায়াপার এর কারণে অনেক সময় এই র‍্যাশ হতে পারে। র‍্যাশ ক্রিম আপনার সোনামণিকে এক্ষেত্রে আরাম এবং সুরক্ষা দুটোই দিতে পারে।

  •  বেবি সোপঃ

নবজাতকের জন্য বেবি সোপ কিনে রাখতে পারেন। বেবি সোপ আলাদা ভাবে নবজাতকের স্কিন এর কথা মাথায় রেখেই বানানো। তাই সাধারণ সাবানের মত বেবি সোপ বাচ্চার স্কিন কে ড্রাই করে ফেলবেনা।

  • ফর্মুলা বোতলঃ

বাচ্চা যদি কোনো কারণে বুকের দুধ প্রয়োজনমত না পায় তাহলে আপনার যে জিনিস অবশ্যই লাগবে সেটা হল ফর্মুলা বোতল। কারণ নবজাতক কে দিনে ৮-১২ বার খাওয়াতে হয়। তাই হাতের কাছে রেখে দিতে পারেন আগেই।

  •  হাতমোজাঃ

নবজাতকের হাতের নখ বেশ বড় এবং নরম থাকে। জন্মের পরপর ই সেই নখ কাটতে চাওয়া বেশ রিস্কি। দেখা যায় এর মাঝেই সে নিজের গায়ে নিজে আঁচড় দিয়ে ফেলে। তাই সেইফ হল হাত মোজা পরিয়ে দেয়া। এরপর সময় সুযোগমত নখ কেটে দেয়া।

হাত মোজা
  • আরামদায়ক জামা, প্যান্ট এবং মোজাঃ

নবজাতকের শরীর যেহেতু তাপমাত্রা ধরে রাখতে পারেনা তাই দ্রুত ঠান্ডা হয়ে যায় শরীর। যেটা নবজাতকের জন্য বিপদজনক। তাই এমন জামাকাপড় এবং মোজা কিনে রাখুন যেটা তাকে একইসাথে আরাম ও দিবে এবং উষ্ণ রাখতেও সাহায্য করবে।

প্রেগন্যান্সির জার্নির চেয়ে ডেলিভারি এর পরের জার্নি একদম ই সহজ নয়। তাই কিছুটা প্রস্তুতি আপনার এই সময়টাকে একটু সহজ করতে সাহায্য করবে। নিজের যত্ন নিতে একদম ই ভুলবেন না এবং যতটা পারুন এই সময়ের জন্য প্রস্তুতি নিয়ে রাখুন। হ্যাপি প্যারেন্টহুড 🙂

ডেলিভারি পরবর্তী বেবি এবং মায়ের দরকারি কি কি জিনিস প্রয়োজন হয়?